
রাজশাহী প্রতিনিধি: নারীসহ অন্তরঙ্গ অবস্থার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় রাজশাহীর মোহনপুরের বসন্তকেদার দারুস সুন্নাত দাখিল মাদরাসার সুপারিন্টেন্ডেন্ট মাওলানা মো. গোলাম মোস্তফাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ এবং এলাকায় ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনার পর সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সাময়িক বরখাস্তের পরও প্রশ্ন উঠেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির প্রকৃত সত্য কী, এটি কোথায় ও কী পরিস্থিতিতে ধারণ করা হয়েছে এবং ভিডিওটি সম্পাদিত বা বিকৃত করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হবে কি না।
ভাইরাল ভিডিও ঘিরে তোলপাড়
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এক নারী ও এক পুরুষকে একটি কক্ষে অবস্থান করতে দেখা যায়। ভিডিও ধারণকারীদের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই পুরুষকে নিজেকে ‘গোলাম মোস্তফা’ এবং শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিতে শোনা যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।
সোমবার সকাল ১১টার দিকে বসন্তকেদার দারুস সুন্নাত দাখিল মাদরাসায় ম্যানেজিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সুপারিন্টেন্ডেন্ট মাওলানা মো. গোলাম মোস্তফাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে মাদরাসার সহকারী সুপার মো. ইছাহাক আলীকে ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে সিদ্ধান্তের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি শারীরিক সমস্যার কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত আবেদন করেন।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ইসারুল হক বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা সভা করে সুপারকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরবর্তী বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তদন্তের কথা বলা হয়েছিল
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারাও তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
এর আগে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম মাহমুদ হাসান জানিয়েছিলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সাময়িক বরখাস্তসহ বেতন-ভাতা বন্ধের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
রাজশাহী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জায়েদুর রহমানও বিষয়টিকে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করে তদন্তের কথা জানিয়েছিলেন।
মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিমা বিনতে আখতারও জানিয়েছিলেন, অভিযোগটি তদন্ত করা হবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এরই মধ্যে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সুপারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনের বিষয়টি সামনে এসেছে।
নিজেকে নির্দোষ দাবি সুপারের
এদিকে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজশাহীর একটি প্রেসক্লাবে উপস্থিত হয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন গোলাম মোস্তফা। এর আগে গণমাধ্যমের কাছেও তিনি ঘটনাটিকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছিলেন।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার বক্তব্য হিসেবে, ‘আমাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হচ্ছে’—এমন দাবি উঠে এসেছে।
তবে তার এ দাবির পাশাপাশি ভাইরাল ভিডিওতে ওই ব্যক্তির নিজের নাম ও পরিচয় দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ভিডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও সত্যতা যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে মাদরাসা সুপার গোলাম মোস্তফার বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘তদন্তেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে’
মাদরাসার সহকারী শিক্ষক ওবাইদুল্লাহ বলেন, ভিডিওতে যা দেখা গেছে, সেটির ভিত্তিতে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে থাকেন, সেটিও তদন্তে প্রমাণিত হওয়া উচিত।
তার ভাষ্য, ঘটনাটি যদি কাউকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে সাজানো হয়ে থাকে, তাহলে ভিডিওটির পেছনের পুরো ঘটনা, ভিডিও ধারণকারীরা কারা এবং কী উদ্দেশ্যে তারা সেখানে গিয়েছিলেন—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
প্রায় ২৮ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে
মাদরাসা-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গোলাম মোস্তফা প্রায় ২৮ বছর ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং সরকারি বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন। তার চাকরির মেয়াদ আরও প্রায় পাঁচ বছর রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মাদরাসা সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ৩৫ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ১১ জন উত্তীর্ণ এবং ২৪ জন অকৃতকার্য হয়েছে। বর্তমানে মাদরাসাটিতে প্রায় ৩৫০ শিক্ষার্থী এবং ২৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন বলে আগের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি নিরপেক্ষ তদন্ত
সুপারকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তে শিক্ষকরা সন্তোষ প্রকাশ করলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
তাদের দাবি, শুধু সাময়িক বরখাস্ত করলেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত নয়। একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ভিডিওটির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা, ধারণের স্থান ও সময়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ভিডিওটি সম্পাদিত বা আংশিকভাবে প্রচার করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছে তারা।
এখন নজর তদন্তে
ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখন তদন্ত। একদিকে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং তা ঘিরে ওঠা গুরুতর অভিযোগ; অন্যদিকে অভিযুক্ত সুপারের পক্ষ থেকে রয়েছে ষড়যন্ত্রের দাবি।
ফলে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে এর মূল উৎস, পূর্ণাঙ্গ ফুটেজ, ভিডিও ধারণের সময়কার পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং প্রয়োজন হলে প্রযুক্তিগত পরীক্ষার মাধ্যমে ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
সাময়িক বরখাস্তের মধ্য দিয়ে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক পদক্ষেপ শুরু করেছে। তবে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং অভিযোগটি ষড়যন্ত্রমূলক হলে এর পেছনে কারা জড়িত—সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে, সাময়িক বরখাস্তের পর স্থানীয়দের নজর এখন তদন্তের ফলাফলের দিকে। অভিযোগের সত্যতা, ভিডিওটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট এবং দায়ীদের বিষয়ে তদন্তেই মিলতে পারে চূড়ান্ত উত্তর।