রাজশাহী প্রতিবেদক: রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় সংসদ সদস্যের বরাদ্দে বাস্তবায়নাধীন তিনটি উন্নয়ন প্রকল্পে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একটি প্রকল্পে নির্ধারিত কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই এবং অপর দুটি প্রকল্পে কাজ শুরু না করেই পুরো বরাদ্দের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের তীর স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা, প্রকল্প সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দিকে। তবে অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রোববার (১৯ জুলাই) সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, একটি রাস্তার পাশে মাত্র এক ট্রাক ইট রাখা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সংসদ সদস্যের সম্ভাব্য সফরের খবর পাওয়ার পর কয়েকদিন আগে ওই ইট আনা হয়। এর বাইরে সেখানে কোনো নির্মাণসামগ্রী বা কাজের দৃশ্য দেখা যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার জাহানাবাদ ইউনিয়নের জাহানাবাদ স্কুলসংলগ্ন বাবুলের বাড়ি থেকে শাহানাদের বাড়ি পর্যন্ত ৫০০ ফুট ইট সোলিং রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে নির্ধারিত ৫০০ ফুটের পরিবর্তে মাত্র ৩৬২ ফুট কাজ করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প অনুযায়ী রাস্তার প্রস্থ ৮ ফুট হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ৭ ফুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে এবং অসম্পূর্ণ কাজ শেষ না করেই পুরো বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
ওই প্রকল্পের সভাপতি আব্দুস সামাদ মেম্বার বলেন, প্রকল্পটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিন আহমেদের মাধ্যমে এসেছে। তিনি কেবল কাগজে-কলমে সভাপতি ছিলেন। রাস্তার বাকি অংশে আগে মাটি ভরাটের প্রয়োজন থাকায় কাজ শেষ করা যায়নি। এছাড়া রাস্তা আগে থেকেই ৭ ফুট প্রশস্ত থাকায় তা ৮ ফুট করা সম্ভব হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে, কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় চক বিরহী সরদারপাড়া মসজিদ থেকে আফজালের বাড়ি পর্যন্ত এবং চক বিরহী সোলাইমানের বাড়ি থেকে ঈদগাহ পর্যন্ত দুটি ইট সোলিং রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে কোনো কাজ শুরু না করেই সম্পূর্ণ বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প সভাপতি কামাল মেম্বারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের বিষয়ে কামাল মেম্বার বিল উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, জুন মাস শেষ হয়ে যাওয়ায় বিল উত্তোলন করা হয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। নির্মাণসামগ্রী প্রস্তুত রয়েছে এবং দ্রুত কাজ শুরু হবে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে কাজ শুরুর আগেই পুরো বিল উত্তোলনের বিধান আছে কি না—এ প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, প্রকল্পগুলোর কাগজে-কলমে সভাপতি আব্দুস সামাদ ও কামাল মেম্বার হলেও পুরো কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিন আহমেদ। প্রকল্প সভাপতি ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে তিনি এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, রাস্তার প্রস্থ নির্ধারণ করা ছিল না। যতটুকু সম্ভব হয়েছে, ততটুকুই করা হয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে অন্য দুটি প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি। বিল উত্তোলনের বিষয়টি প্রকল্প সভাপতিরাই ভালো বলতে পারবেন। তিনি কেবল একটি প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপির এক নেতা বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের হলেও এখানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, দুটি প্রকল্পের কোনো কাজই এখনো শুরু হয়নি। শুধু একটি রাস্তায় এক ট্রাক ইট রাখা হয়েছে। কাজ না করেই যদি টাকা তুলে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি শামিমুল ইসলাম মুন বলেন, কাজ না করে টাকা উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ সত্য হলে এটি গুরুতর অপরাধ। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, কাজ সম্পন্ন না হলেও প্রকল্পের অর্থ ছাড় দেওয়ার অভিযোগে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) প্রকৌশলী মো. তারিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন বলেন, বিষয়টি আগে তাঁর জানা ছিল না। অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “আমার নির্বাচনী এলাকায় কাজ না করে সরকারি অর্থ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এ জাতীয় আরো খবর..