রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে উঠেছে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগে ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে রোগীর স্বজন ও সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সচালকদের মধ্যে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে মরদেহ পরিবহণকে কেন্দ্র করে অসহায় স্বজনদের কাছ থেকে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো চালক মরদেহ বহনের চেষ্টা করলে তাকে মারধর ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও দাবি ভুক্তভোগীদের।
স্থানীয় সূত্র ও একাধিক অ্যাম্বুলেন্সচালকের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র হাসপাতালকেন্দ্রিক এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় দাপট এবং কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় তারা কার্যত পুরো লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ফলে শোকাহত পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে মরদেহ বাড়িতে নিতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজশাহী মহানগর পুলিশের নির্ধারিত ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৩০ টাকা হলেও বাস্তবে আদায় করা হচ্ছে তিন থেকে চারগুণ পর্যন্ত বেশি। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে মরদেহ নিতে প্রায় ১২ হাজার টাকা এবং কুষ্টিয়ায় মরদেহ পাঠাতে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্বজনদের দাবি, শোকের মুহূর্তে দর-কষাকষি করার সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।
সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সচালকদের ভাষ্য, সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ রোগীর স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে হেনস্তা করা হয়। কয়েকজন চালককে মারধরের অভিযোগও উঠেছে। সম্প্রতি ডলার নামের এক চালক চাঁদা দাবির অভিযোগে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের কিছু দালাল ও অসাধু কর্মচারী মারা যাওয়া রোগীর তথ্য দ্রুত সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেন। এরপর তারা মরদেহের স্বজনদের ঘিরে ধরে নিজেদের নির্ধারিত গাড়িতে লাশ নিতে চাপ সৃষ্টি করেন। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
শুধু অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াই নয়, হাসপাতাল এলাকার ফুটপাতের দোকান, খাবারের হোটেল ও স্ট্যান্ড থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা না দিলে তাদের ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিযোগের বিষয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার মো. নূর আলম সিদ্দিকী বলেছেন, পুলিশের কোনো সদস্য জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনার কথা জানিয়েছে।
এদিকে সচেতন মহল বলছে, একটি সরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে যদি মরদেহ পরিবহণেও সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের উদাহরণ। তারা অবিলম্বে প্রশাসনের কঠোর অভিযান, নির্ধারিত ভাড়া বাস্তবায়ন, ফিটনেসবিহীন অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শোকাহত পরিবারকে জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা আদায় শুধু অনৈতিক নয়, এটি মানবিক অপরাধও। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
সুত্র দৈনিক যুগান্তর
এ জাতীয় আরো খবর..