মোঃ শাহীন সাগর, সাজেক থেকে ফিরেঃ মেঘের ভেলায় ভেসে থাকা পাহাড়, দিগন্তজোড়া সবুজ আর নীরব প্রকৃতির মাঝে ভেসে আসে আজানের সুমধুর ধ্বনি। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে দাঁড়িয়ে থাকা ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’ এখন শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং পর্যটকদের জন্য আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার রুইলুইপাড়ায় অবস্থিত এই মসজিদটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট উচ্চতায় নির্মিত। দেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত মসজিদ হিসেবে ইতোমধ্যে এটি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।
সাজেকের পাহাড়চূড়ায় নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদে প্রতিদিন স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘুরতে আসা শত শত পর্যটক নামাজ আদায় করতে ভিড় করেন। মেঘে ঘেরা পাহাড়ি পরিবেশে ইবাদতের সুযোগ পেয়ে অনেকেই একে “অন্যরকম প্রশান্তির স্থান” হিসেবে বর্ণনা করছেন।
চারতলা ভিতের ওপর নির্মিত মসজিদটির উচ্চতা প্রায় ২২ ফুট। ৫ হাজার ২৬৫ বর্গফুট আয়তনের এ স্থাপনায় রয়েছে চারটি গম্বুজ ও একটি সুউচ্চ মিনার। পূর্ব-পশ্চিমে এর দৈর্ঘ্য ৬৫ ফুট এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রস্থ ৮১ ফুট। নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মসজিদটি সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে যেন একাত্ম হয়ে গেছে।
২০২০ সালে সেনাবাহিনী ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। একই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি রুইলুইপাড়ার হেলিপ্যাড সংলগ্ন এলাকায় মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক চট্টগ্রাম ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান। প্রায় দুই বছর নির্মাণকাজ শেষে ২০২২ সালের পহেলা রমজানে এ মসজিদে আনুষ্ঠানিকভাবে নামাজ আদায় শুরু হয়।
বর্তমানে মসজিদটি সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা ও তারাবির জামাতে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পর্যটক অংশ নেন।
মসজিদের পেশ ইমাম জানান, সাজেকে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন হাজার পর্যটক আসেন। ছুটির দিনে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। আগে পর্যটকদের নামাজ আদায়ে নানা অসুবিধা হলেও এখন তারা স্বাচ্ছন্দ্যে এখানে ইবাদত করতে পারছেন।
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক আজাদ আলী বলেন, “মেঘে ঘেরা পাহাড়ের মধ্যে এমন সুন্দর পরিবেশে নামাজ আদায় করে ভিন্ন ধরনের মানসিক প্রশান্তি অনুভব করছি।”
নওগাঁর পর্যটক মোদাস্সের হোসেন খাঁন বলেন, “সাজেকের মতো পাহাড়চূড়ায় এত সুন্দর একটি মসজিদ থাকবে, সেটা কল্পনাও করিনি। এখানে নামায আদায় করেছি। এটি সত্যিই ব্যতিক্রমী।”
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক জানান, পাহাড়ি এলাকায় পানি সংকট থাকায় ওজুসহ প্রয়োজনীয় সব পানি কিনে ব্যবহার করতে হয়। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী, পর্যটক ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় মসজিদের ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে।
প্রায় এক একর জমির ওপর নির্মিত এই মসজিদে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। স্থানীয়দের মতে, সাজেকে পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’ এখন দেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী ধর্মীয় ও দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
মেঘ, পাহাড় আর আধ্যাত্মিক আবহে ঘেরা এই মসজিদ যেন একসঙ্গে বহন করছে সৌন্দর্য, শান্তি ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা।
এ জাতীয় আরো খবর..